রহস্যে ঘেরা টাইটানিক

 

রহস্য, রোমাঞ্চ, মৃত্যু আর ট্র্যাজেডি এইসব কিছু মিলিয়েই ইতিহাসের সবচেয়ে বিশাল এবং বিলাসবহুল জাহাজ টাইটানিকের গল্প! 

গ্রিক পুরানের একজন শক্তিশালী দেবতার নাম হলো টাইটান’। তার নাম অনুসারেই মূলত এই জাহাজের নাম রাখা হয়েছিল ‘টাইটানিক’। এটি আসলে জাহাজটির সংক্ষিপ্ত নাম। এই জাহাজের সম্পূর্ণ নাম হলো RMS TITANIC, যা ছিল ব্রিটিশ শিপিং কোম্পানি হোয়াইট স্টার লাইনের মালিকানাধীন। এই জাহাজটি নির্মাণ করা হয় ইউনাইটেড কিংডমের বেলফাস্টের হারল্যান্ড ওলফ্ শিপইয়ার্ডে। জন পিয়ারপন্ট মরগান নামক একজন আমেরিকান কোটিপতির এবং ইন্টারন্যাশনাল মার্কেন্টাইল মেরিন কোং এর ফান্ডিং এ ১৯০৯ সালের ৩১ মার্চ টাইটানিকের নির্মাণকাজ শুরু হয়। তখনকার প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন (বর্তমানে প্রায় ১৬৫ মিলিয়ন) ডলার ব্যয়ে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় ৩১ মার্চ ১৯১২ সালে। এই জাহাজের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৮৮২ ফুট দুই ইঞ্চি এবং প্রস্থ ছিল প্রায় ৯২ ফিট। এ জাহাজটির ওজন ছিল প্রায় ৪৬ হাজার ৩২৮ লং টন। পানি থেকে জাহাজটির ডেকের উচ্চতা ছিল ৫৯ ফুট।

জাহাজটি একসঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫৪৭ জন প্যাসেঞ্জার ও ক্রু বহন করতে পারত। টাইটানিকের ফার্স্ট ক্লাস যাত্রীদের জন্য বিলাসবহুল ডাইনিংয়ের ব্যবস্থা ছিল। সেখানে একই সঙ্গে ৫৫০ জন খাবার খেতে পারত। এছাড়াও এর ভিতরের দিকে ছিল সুইমিং পুল, জিমনেসিয়াম, স্কোয়াস খেলার কোট, ব্যয়বহুল তুর্কিস বাথ, ব্যয়বহুল ক্যাফে এবং ফার্স্ট ক্লাস ও সেকেন্ড ক্লাস উভয় যাত্রীদের জন্য আলাদা বিশাল লাইব্রেরি। এর বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাও ছিল খুবই উন্নত মানের। এ জাহাজের ফার্স্ট ক্লাসের জন্য তিনটি এবং সেকেন্ড ক্লাসের জন্য একটি লিফটের ব্যবস্থা ছিল।

আটলান্টিক একবার অতিক্রম করতে জাহাজের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্যাকেজটিতে ব্যয় করতে হতো তখনকার প্রায় ৪ হাজার ৩৫০ ডলার (বর্তমানে প্রায় ৯৫ হাজার ৮৬০ ডলার)।

টাইটানিক প্রায় ৬৪টি লাইফবোট বহন করতে সক্ষম ছিল, যা প্রায় ৪০০০ লোক বহন করতে পারত।

এই টাইটানিক যখন বানানো হয়েছিল তখন এর ডিজাইনার ‘থমাস এন্ড্রু’ দাবি করেছিলেন এই টাইটানিক কোনো দিন ডুবানো সম্ভব না।

টাইটানিকের ক্যাপ্টেন ছিলেন ১৫ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইংল্যান্ডের রাজকীয় কমান্ডার এডওয়ার্ড জন স্মিথ। তার নেতৃত্বে টাইটানিক ১৯১২ সালের ১০ এপ্রিল ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন থেকে নিউইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।

১৪ এপ্রিল ১৯১২ তারিখ রাতে সমুদ্রের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রিরও কাছাকাছি নেমে যায়। আকাশ পরিষ্কার থাকলেও চাঁদ দেখা যাচ্ছিল না। সামনে আইসবার্গ আছে এ সংকেত পেয়ে জাহাজের ক্যাপ্টেন জাহাজের গতি সামান্য দক্ষিণ দিকে ফিরিয়ে দেন। সেদিনই দুপুর এবং বিকেলের দিকে দুটি ভিন্ন ভিন্ন জাহাজ থেকে রেডিওর মাধ্যমে যোগাযোগ করে টাইটানিকের সামনে বড় একটি আইসবার্গ আছে বলে সতর্ক করে দেওয়া হয় টাইটানিককে।

কিন্তু টাইটানিকের রেডিও অপারেটরদের অবহেলার কারণে ঐ তথ্য টাইটানিকের মূল যোগাযোগ কেন্দ্রে পৌছায়নি। সেদিনই রাত ১১:৪০-এর সময় টাইটানিকের পথ পর্যবেক্ষণকারীরা সরাসরি টাইটানিকের সামনে সেই আইসবার্গটি দেখতে পায়। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। টাইটানিকের ফার্স্ট অফিসার মুর্ডক বামে মোড় নেওয়ার অর্ডার দেন এবং জাহাজটিকে সম্পূর্ণ উল্টাদিকে চালনা করতে বা বন্ধ করে দিতে বলেন। তবুও টাইটানিককে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মোড় নিতেই ডানদিকের আইসবার্গের সঙ্গে প্রচণ্ড ঘষা খেয়ে চলতে থাকে টাইটানিক। ফলে টাইটানিকের প্রায় ৯০ মিটার অংশ জুড়ে চিড়ে যায়।

জাহাজটি আস্তে আস্তে ডুবতে থাকে। ঘটনার আকস্মিকতায় ক্যাপ্টেন স্মিথ মূল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে আসেন এবং জাহাজটি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেন। ১৫ তারিখ মধ্যরাতের দিকে টাইটানিকের লাইফবোটগুলো নামানো শুরু হয়। টাইটানিক বিভিন্ন দিকে জরুরি বিপদ সংকেত পাঠিয়েছিল। টাইটানিকের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র হতে দূরবর্তী একটি জাহজের আলো দেখা যাচ্ছিল যার পরিচয় এখনো রহস্যে ঘেরা।

এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে খুব অল্পসংখ্যক মানুষই জীবিত ফিরে আসতে পেরেছে। টাইটানিক দুর্ঘটনায় অসংখ্য পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জনকারীকে হারিয়েছিল। কেবলমাত্র সাউদাম্পটনের প্রায় ১০০০ পরিবার সরাসরিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


অনেকেরই ধারণা ছিল টাইটানিক জাহাজে কোনো অভিশাপ ছিল। এ যুক্তি প্রমাণ করার অন্যতম একটি কারণ হিসেবে তারা দেখিয়েছিল টাইটানিকের নম্বর ৩৯০৯০৪। পানিতে এর প্রতিবিম্বের পাশ পরিবর্তন করলে হয়
no popeএছাড়াও টাইটানিককে ঘিরে আরো অনেক গল্পের প্রচলন রয়েছে। যুগ যুগ ধরে অসংখ্য বিশেষজ্ঞ টাইটানিককে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন কিন্তু এরপরও টাইটানিক চিরকালই রহস্যের আড়ালে রয়ে গেছে।

১৯৯৮ সালের ১৯ অক্টোবরে টাইমস জানিয়েছে এক রহস্যময় কাহিনী।

টাইটানিক জাহাজে নাকি ছিল মিসরীয় এক রাজকুমরীর অভিশপ্ত মমি। মমির অভিশাপের কারণেই ভাসমান বরফদ্বীপের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল টাইটানিক!

খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সালের দিকে মারা যান ‘প্রিন্সেস অভ আমেন-রা’। নীলনদের পাশে ল্যুক্সরে তাঁর সৎকার করা হয়। উনিশ শতকের নব্বই শতকের শেষ দিকে চার জন ইংরেজকে ওই রাজকুমারীর মৃতদেহসহ একটি মমি কেনার জন্য আহ্বান জানানো হয়। উৎসাহী ইংরেজদের একজন বেশ কয়েক হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে বিক্রেতার কাছ থেকে মমিটি কেনেন এবং সেটিকে নিয়ে আসেন তাদের হোটেলে। কয়েক ঘন্টা পর মরুভূমির দিকে হেঁটে যেতে দেখা যায় ওই ক্রেতা ব্যক্তিকে। তিনি আর কখনও ফিরে আসেন নি। পরেরদিন আরেকজন ইংরেজ এক মিশরীয় দাস কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হন। তৃতীয় ব্যক্তি দেশে ফিরে আসেন, কিন্তু দেখেন যে, ব্যাংকে গচ্ছিত সমস্ত অর্থ লোপাট হয়ে গেছে অন্য কারও জালিয়াতির মাধ্যমে। চতুর্থ ব্যক্তি পড়েন প্রচন্ড অসুখে। চাকুরী চলে যায় তার। শেষমেশ তিনি রাস্তায় দিয়াশলাই বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। 

অনেক ঝামেলার পর মমিটি পৌঁছে যায় ইংল্যান্ডে। কিন্তু তবু অভিশপ্ত অধ্যায়ের শেষ হয়নি। ওই কফিনের সাথে সর্ম্পকযুক্ত যে কোন মানুষের ভাগ্যে জুটেছিল দূর্ঘটনা বা মৃত্যু। এমনকী ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রদর্শনের জন্য সংরক্ষিত মমিটির একজন দর্শনার্থীর ভাগ্যেও জুটে চরম দুর্দশা। ওই দর্শনার্থী মহিলা চরম তাচ্ছিল্যভরে একটি ময়লা পরিষ্কার করার কাপড় দিয়ে মুছেছিলেন কফিনে অঙ্কিত রাজকুমারীর মুখচ্ছবি। কয়েকদিন পর তার সন্তান মারা যায় হাম রোগে। 

মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ মমিটিকে বেসমেন্টে সরিয়ে নেবার সিদ্ধান্ত নেয়। এক সপ্তাহের মাঝেই মমি সরানোর কাজে অংশগ্রহনকারী একজন প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওই কাজের তত্বাবধায়ককে তার অফিসের ডেস্কের উপর মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। স্বভাবতই ব্যাপারটি সংবাদপত্রে আসে। একজন ফটো সাংবাদিক ছবি তুলে ডেভেলপ করে দেখতে পান যে, রাজকুমারীর মুখের বদলে এক বীভৎস চেহারা। জানা যায় যে ওই সাংবাদিক গুলিতে আত্মহত্যা করেন।

প্রায় দশ বছর ধরে ঘটতে থাকে এইসব ঘটনা-উপঘটনা। চূড়ান্তভাবে মমিটিকে বিক্রি করা হয় একজন সৌখিন সংগ্রাহকের কাছে। বিচিত্র রকমের দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির পর মমিটিকে তিনি নির্বাসন দেন নিজ বাড়ীর চিলেকোঠায়। অভিশপ্ত ঘটনার পরও একজন মার্কিন প্রত্নতত্ববিদ কিনে নেন মিশরীয় রাজকুমারীর মমি। নিউইর্য়কগামী একটি জাহাজে বুক করেন ওই মমিটি, নিজেও ওঠেন ওই জাহাজে। সেই জাহাজটির নাম ‘টাইটানিক'!

বিগত শতাব্দীর অন্যতম আলোচিত বিষয় টাইটানিক ডুবে যাওয়া কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিত কোনো অপরাধ তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে এখনো! টাইটানিকের মালিকানা প্রতিষ্ঠান হোয়াইট স্টার লাইন তাদের পুরনো জাহাজের জন্য বীমা প্রতিষ্ঠান থেকে মোটা টাকা আদায় করতে বিগত শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ধাপ্পাবাজির আশ্রয় নেয়!

টাইটানিকের মালিকানা প্রতিষ্ঠান হোয়াইট স্টার লাইনের ছিল একই রকম দেখতে দুটি জাহাজ। অলিম্পিক এবং টাইটানিক। তারা টাইটানিকের নাম করে পুরনো মেয়াদ উত্তীর্ন অলিম্পিকে আটলান্টিক সাগরে ইচ্ছাকৃতভাবে ডুবিয়ে দিয়েছিল।

টাইটানিকের মালিকানা প্রতিষ্ঠান হোয়াইট স্টার লাইন ১৯০৭ সালে তিনটি বিলাসবহুল সুপার লাইনার নির্মাণের পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে নির্মাণ করা হয় অলিম্পিক। তারপর টাইটানিক এবং সব শেষে ব্রিটানিক।
 

 

১৯১১ সালের ১৪ জুন অলিম্পিক তার প্রথম যাত্রা করে। একই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর অলিম্পিক তার পঞ্চম যাত্রায় ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস এর সঙ্গে ধাক্কা লেগে অলিম্পিকের নিচের দিকে দুটি বিশাল ছিদ্র হয়ে যায়। তখন হোয়াইট স্টার লাইন মেরামতের জন্য বীমা কোম্পানির কাছে বীমার টাকা দাবি করে। কিন্তু অলিম্পিকের এই দুর্ঘটনার কারণে অলিম্পিককে বীমার অযোগ্য ঘোষণা করে বীমা কোম্পানি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

এইদিকে আরো একটি বিশাল জাহাজ নির্মাণাধীন থাকায় হোয়াইট স্টার লাইন ছিল দেউলিয়া হবার পথে। তাদের বিলাসবহুল টাইটানিক নির্মাণের জন্য বিনিয়োগ করেন তৎকালীন আমেরিকার কুখ্যাত বিনিয়োগকারী জেপি মরগান। অন্যদিকে হোয়াইট স্টার লাইনের মালিক ব্রুজ ইজমি ছিল অত্যন্ত কঠোর ও কুট ব্যবসায়ী। তারা দুজনেই বীমা জালিয়াতি করার প্ল্যান শুরু করে।

তখনই তারা চিন্তা করেন যদি অলিম্পিক জাহাজের নাম বদলে  টাইটানিক রাখা হয় আর টাইটানিক নামধারী পুরনো জাহাজটি ডুবিয়ে দেয়া হয়, তাহলেই তারা বীমার পুরো টাকাটা পেয়ে যাবেন। ঐ দুই ব্যবসায়ী এই সুযোগটির কাজে লাগান। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত অলিম্পিকে সাউথ্যাম্পটন বন্দরে কোনো রকমের চলার উপযোগী করে এর পূর্ণাঙ্গ মেরামতের জন্য বেলফাস্টে নিয়ে আসা হয়। তখন বেলফাস্টের টাইটানিকের নির্মাণ কাজও প্রায় শেষ। টাইটানিক আর অলিম্পিক ভেতর বাহির সবদিক থেকে দেখতে একদম হুবহু। পাশাপাশি রাখা অবস্থায় সাধারণ লোকের পক্ষে কিছুতেই বলা সম্ভব না কোনটা অলিম্পিক আর কোনটা টাইটানিক।

১৯১২ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে টাইটানিক ও অলিম্পিককে শেষবারের মতো পাশাপাশি রাখা হয়। আর সেই সুযোগেই পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হাত সাফাইয়ের কাজটি করা হয়। হোয়াইট স্টার লাইন দাবি করে ১৯১২ সালের মার্চের ৭ তারিখে অলিম্পিক মেরামতের কাজ শেষ করে বেলফাস্ট ত্যাগ করে। কিন্তু  এটি মূলত নতুন জাহাজ টাইটানিক। পুরনো জাহাজ অলিম্পিকের নাম ধারণ করে বন্দর থেকে বেরিয়ে আসে। তার ঠিক ৩ সপ্তাহ পরে পুরনো জাহাজ অলিম্পিক নতুন টাইটানিক নাম ধারণ করে এর প্রথম যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নেয়।

এখন থেকে যতবারই টাইটানিকের কথা বলা হবে, ধরে নিতে হবে সেটি আসলে অলিম্পিক।

টাইটানিকের প্রথম যাত্রার জন্য বেলফাস্ট থেকে সাউথ্যাম্পটন বন্দরে নিয়ে আসার পর টাইটানিকের বহু কর্মী কাজে ইস্তফা দিয়ে জাহাজ থেকে নেমে যায়। এসময় ব্রিটেনে চলছিল জাতীয় কয়লা ধর্মঘট। কয়লা ধর্মঘটের কারণে বহু জাহাজ বন্দরে আটকে ছিল। হাজার হাজার নাবিকেরা তখন কর্মহীন ছিল। সেই আকালের সময়ও টাইটানিকের কর্মীরা কেন চাকরি ছেড়ে চলে গেল?

কারণ তারা জানতে পেরেছিল আর কয়েক দিনের মধ্যেই জাহাজটিকে ডুবিয়ে দেয়া হবে। আরো সন্দেহের বিষয় হলো যাত্রা শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে জাহাজের মালিক জেপি মরগান সহ টাইটানিকের ৫৫ জন প্রথম শ্রেণির যাত্রী তাদের যাত্রা বাতিল করে। অথচ টাইটানিক তৈরির সময় জেপি মরগান নিজেই জনসম্মুখে ঘোষণা করেছিল টাইটানিকের প্রথম যাত্রায় সে অবশ্যই সফর করবে। ১৯১২ সালের ১০ এপ্রিল জাহাজের তিন ভাগের মাত্র দুই ভাগ যাত্রী নিয়ে টাইটানিক সাউথ্যাম্পটন বন্দর থেকে নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে প্রথম যাত্রা করে। তবে টাইটানিকের মালিকেরা চিন্তায় ছিল, যখন টাইটানিক তারা ডুবিয়ে দিবে তখন এতগুলো যাত্রীর কি হবে!

সেজন্য তারা একটি উদ্ধারকারী জাহাজ তৈরি রাখার পরিকল্পনা করে। জেপি মরগানের আরো একটি পণ্যবাহী জাহাজ হল ক্যালিফোর্নিয়ান। যেটি কয়লা ধর্মঘটের কারণে ব্রিটেনের লন্ডন বন্দরে আটকে ছিল। এরপর হঠাৎ করে রহস্যজনকভাবে ক্যালিফোর্নিয়ান কয়লা ছাড়াই বন্দর ত্যাগ করে আমেরিকার উদ্দ্যেশে যাত্রা শুরু করে। সেই মুহূর্তে ক্যালিফোর্নিয়ায় যে পরিমাণ কয়লা ছিল তা দিয়ে কিছুতেই আমেরিকায় পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। তাছাড়া বন্দর ছাড়ার মুহূর্তে জাহাজটিতে কোনো মালামাল বা যাত্রী কোনো কিছুই ছিল না। পুরোপুরি খালি জাহাজটিতে তখন ছিল শুধুমাত্র তিন হাজার কম্বল ও শীতবস্ত্র। টাইটানিক ডুবে গেলে একটি উদ্ধারকারী জাহাজে যা থাকা দরকার এবং যে পরিমাণ দরকার ঠিক তাই। ক্যালিফোর্নিয়ান তার পুর্ণ গতিতে আটলান্টিকের দিকে ছুটতে থাকে।

হোয়াইট স্টার লাইনের পরিকল্পনা মতো টাইটানিকের ক্যাপ্টেন দুর্ঘটনার নাটক সাজাতে গিয়ে সত্যি সত্যি এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়। এধরণের আপদকালীন পরিস্থিতিতে একটি জাহাজের যা যা করণীয় টাইটানিক তার কোনোটিই গ্রহণ করেনি। আইসবার্গের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার পর ক্যাপ্টেন জাহাজের ইঞ্জিন ঘুরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়। যাতে করে আইসবার্গের সঙ্গে জাহাজের আরো বেশি করে ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

জাহাজটাকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই তখন তারা কেউ করেনি। আইসবার্গের সঙ্গে ধাক্কা লাগার দীর্ঘ ৩৫ মিনিট পর টাইটানিক থেকে উদ্ধারের জন্য রেডিও বার্তা পাঠায়। অথচ একটি জাহাজ ডুবে যাওয়ার জন্য আধাঘন্টা সময় যথেষ্ট। এছাড়া টাইটানিক ডুবতে শুরু করার এক ঘন্টা ২৫ মিনিট পর লাইফবোর্ড জাহাজ থেকে নামানো হয়। টাইটানিকের ক্যাপ্টেন উদ্ধারের জন্য ক্যালিফোর্নিয়ানের অপেক্ষা করছিল। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ান টাইটানিকের আশেপাশে থাকলেও একজন যাত্রীর জীবন রক্ষা করতে পারেনি।

রাত দুটার মধ্যে জাহাজটি দুই ভাগ হয়ে পানির নিচে তলিয়ে যায়। সেই সঙ্গে প্রায় দেড় হাজার যাত্রী ও ডুবে যায় আটলান্টিকের বরফ-শীতল পানিতে। লাইফবোর্ডে থাকা যাত্রীদের উদ্ধার করা হয় পরদিন সকালে। দুর্ঘটনার একমাস পর ভয়ংকর স্মৃতি নিয়ে টাইটানিকের বেঁচে যাওয়া নাবিকরা ইংল্যান্ডে ফিরে আসে। এসময় তাদের স্বজনদের সঙ্গে প্রথমেই দেখা করতে দেয়া হয়নি। প্রায় ২৪ ঘন্টা এক প্রকার আটকে রাখা হয় তাদেরকে। সে সময় হোয়াইট স্টার লাইনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জীবিত ফিরে আসা কর্মীদেরকে হুমকি দেয়। বলা হয়, তারা টাইটানিক সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করলে তাদের পরিণতিও হবে জাহাজের মতোই।

রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারও বিষয়টি ঠিকঠাক তদন্ত না করে একপ্রকার ধামাচাপা দিয়ে দেয়। এভাবেই টাইটানিক নাম ধারণ করে অলিম্পিক জাহাজটি আটলান্টিক সাগরের নিচে আজও ডুবে আছে।

টাইটানিক ছাড়াও বহু জাহাজ মালিক তাদের পুরনো মেয়াদ উত্তীর্ণ জাহাজ আটলান্টিকের নির্দিষ্ট একটি জায়গায় এনে ডুবিয়ে দেয়। শুধুমাত্র বীমার টাকা আদায় করতে তারা এই প্রতারণার আশ্রয় নেয়। এমনকি আটলান্টিকের ঐ এলাকায় অতি প্রাকৃতিক কিছু আছে বলেও গুজব ছড়ায়। সেটি হলো বার্মুডা ট্রায়েঙ্গেল!

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ